জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আন্দোলনের প্রভাবে অর্থনীতির ক্ষতির হিসাব আসতে শুরু করেছে। দুই দিনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’- কর্মসূচিতে বন্দরসহ কাস্টসম কর্মকর্তারা পুরোপুরি অচল হয়ে পরে। ওই সময় আন্দোলনের ফলে সকল সেবা বন্ধ থাকায় রপ্তানিমূখী তৈরি পোশাক শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিপমেন্টের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বায়িং হাউসগুলোতে মেসেজ ও ফোন করে জানতে চান, কেন সময়মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। যদি আমরা সময়মতো ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের ছাড় দিতে হবে। এই সময়সীমা পূরণ করতে না পারার কারণে জরিমানা, আকাশপথে পণ্য পাঠানোর খরচ অথবা পণ্যের দামে ছাড় দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক কঠিন ছিলো। মূলত এই ধরনের শাটডাউন ব্যবসা করার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট করে। অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি বাড়ে।
তারা জানান, শুল্ক ছাড়পত্র স্থগিত থাকার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৪ হাজার কন্টেইনারের জট তৈরি হয়। এদিকে, ঢাকা কাস্টম হাউসে যাত্রী পরিষেবা ব্যতীত অন্য সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল ওই দুই দিন। সেখানেও বিপুল পরিমাণ পণ্য স্তূপ হয়ে পড়ে। বেনাপোল স্থলবন্দর এবং দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতেও একই অবস্থা ছিলো। ফলে সেখানে পোর্ট চার্জ, শিপমেন্ট চার্জ, লাইন চার্জ, উচ্চ পরিবহনসহ কয়েকটি খাতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একটি সূত্র জানায়, পোর্ট অ্যান্ড ডেমারেজ চার্জ, শিপিং লাইনে জরিমানা, বন্দরের জরিমানাসহ উচ্চ পরিবহণ ভাড়া বাবদ ২ দিনে তৈরি পোশাক খাতে অন্তত ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির পুরো অংক এর চেয়ে দ্বিগুণ বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ। তবে অনেক ফ্যাক্টরি আছে যারা এখনো তাদের ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব দেয়নি।
বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, পোশাক খাতে প্রতিদিন লেনদেনের পরিমান আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। যেটি এনবিআর এর আন্দোলনের ফলে ব্যাহত ছিলো।
উল্লেখ্য, গত ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এই দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর পর থেকে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারে দাবিতে প্রায় দুই মাস আন্দোলন করেন। ২৮ ও ২৯ জুন সারা দেশে কাজ বন্ধ করে দেন তারা। এই আন্দোলনের জেরে এখন পর্যন্ত ৩১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ১৬ জন দুদকের তদন্তাধিন রয়েছেন। এর বাইরেও তালিকায় আছেন আরো ৩৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচল ব্যাহত হয়ে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি কনটেইনার জমে। সাধারণ দিনে বন্দরে যেখানে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টিইইউ সরবরাহ হয়, আন্দোলনের সময় সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১৩৯ টিইইউতে। একদিকে অর্থাৎ ২৯ জুনেই ৪ হাজার কনটেইনার আটকে যায়। চারটি বড় জাহাজ সময়মতো রওনা হতে পারেনি। এর ফলে প্রায় ৩ হাজার টিইইউ রপ্তানি কনটেইনার আটকে যায়।
১৯টি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতেও চাপে ভর করে। যেখানে সাধারণত ৮ হাজার টিইইউ পণ্য মজুত থাকে, আন্দোলনের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৩৭১ টিইইউ। যা ৪৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
বন্দরের কার্যক্রম ছাড়াও কাঁচামালের আমদানি অনুমোদন, ভ্যাট অফিসের সনদপত্র এবং অন্যান্য রপ্তানি-সম্পর্কিত কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কর্মকর্তাদের এই সম্পূর্ণ শাটডাউনের কারণে ২৮-২৯ জুন (শনিবার ও রবিবার) কার্গো ছাড়পত্র এবং রপ্তানি চালান পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। যেখানে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
বিজিএমইএ জানায়, এনবিআর-এর অধীনে থাকা শুল্ক কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ শাটডাউনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অন্তত চারটি কন্টেইনার জাহাজ নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারেনি, যার ফলে বন্দর এবং অভ্যন্তরীণ ডিপোগুলিতে কন্টেইনারের জট বাঁধে।
জানতে চাইলে অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, এখানে যে ক্ষত-ক্ষতির তথ্য এসেছে এটা সামান্য এর বাইরে আমাদের অনেক ফ্যাক্টরি তাদের ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব দেননি। পোর্ট অ্যান্ড অ্যাজেন্ট ডেমারেট চার্জ, শিপিং লাইন জরিমানা, বন্দরের পণ্য পড়ে থাকায় সেগুলোর জরিমান। সবমিলে ক্ষতির পরিমান অনেক। এনবিআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কর্মকর্তাদের দাবি আদায়ে যেনো আমাদের জিম্মি করা না হয়। নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য এনবিআর বন্ধ করে দেয়া কোনোভাবে কাম্য নয়। তবে আমরা আশা রাখবো ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা যেনো না হয়। এনবিআর এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেটি বন্ধ থাকলে পুরোদেশের বাণিজ্য বন্ধ থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তৈরি পোশাকের নেট রপ্তানি ১৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এ পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে পোশাক রপ্তানির মোট আয় কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। যা আগের প্রান্তিকের ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ কম।
সদ্যবিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমেছে। এনবিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসে (জুলাই) রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের জুনে আদায়কৃত ৫৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকার চেয়ে ৯ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা কম। সাধারণত অর্থবছরের শেষ মাসে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক বেশ হয়ে থাকে। কিন্তু এনবিআর বিলুপ্তির প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেড় মাসের আন্দোলনের প্রভাবে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের বিঘœ ঘটে। আমদানি-রপ্তানি ও অন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজস্ব সংগ্রহে। আন্দোলনের শেষ দিকে সব ধরনের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম দুই দিন বন্ধ রাখা হয়। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি থেকে বাদ যায়নি চট্টগ্রাম বন্দরও।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। জুনে রাজস্ব আদায় কম হলেও গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ে ২ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্দোলনের শুধু পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি দেশের সকল ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব খাতে। সাধারণত জুন মাস অর্থবছরের শেষ মাস হওয়ায় তুলনামূলক বেশি রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু আন্দোলনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এই আন্দোলনের বড় প্রভাব পরেছে অর্থনীতিতে।
উল্লেখ্য, এনবিআরে আন্দোলনে অর্থনৈতিক ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য জানতে দেশের সকল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ৯ সদস্যর একটি কমিটিও করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই কমিটিতে অর্থ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, এনবিআর, আইআরডি, ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএর প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছে। এই কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে তারা গত ২৮ ও ২৯ জুন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের অফিস বন্ধ থাকায় রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে।



