আজ মহালয়া আবার এলো দেবীপক্ষ

আবার এলো দেবীপক্ষ। দক্ষিণায়নের দিন। কৈলাশ শিখর থেকে তার আগমনী বার্তায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে উৎসবের রোশনাই। হির্ন্দু বিশ্বাসে,আজ দশভূজা শক্তিরূপে দুর্গা মন্ডপে মন্ডপে অধিষ্ঠান করবেন। আজ শেফালীঝরা শারদ প্রভাতে জলদকণ্ঠে চন্ডিপাঠ আর পিতৃপক্ষের তর্পণের সমাপন ঘটবে। আর এই চন্ডীতেই আছে দেবী দুর্গার সৃষ্টির বর্ণনা এবং দেবীর প্রশসিবত। শারদীয় দুর্গাপূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো এই মহালয়া।
হিন্দুরা মনে করেন,শরতের আকাশে-বাতাসে এখন যেন মন্দ্রিত হচ্ছে ‘রূপংদেহি, জয়ংদেহি, যশোদেহি, দ্বিষোজহি’র সুর লহরী। আজ ঘনঘটার অমাবস্যা তিথিতে প্রাণে দ্যোৎনা তুলে ঢাকে পড়বে কাঠি। সৌর আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের নাম মহালয়া। হিন্দুদের পুরাণে আছে: সৌর উত্তরায়ণকালে বিষ্ণুলোকে যখন দিন,যমলোকে তখন রাত-দক্ষিণায়ন। উত্তরায়ণের ছ’মাস দেবতারা জেগে থাকেন, বিষ্ণুলোকের তোরণ থাকে অবারিত। দক্ষিণায়নের ছ’মাস দেবতারা নিদ্রিত। কিন্তু যমলোকে দিনমান, দুয়ার খোলা। আজ দক্ষিণায়নের পয়লা দিনে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেই বন্ধ দুয়ার ঠেলে পিতৃপুরুষেরা ছুটে আসবেন মর্তলোকে। এ সময় তারা থাকেন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। উত্তর পুরুষদের হাতে একটু শ্রাদ্ধাহার পেলেই তারা পরম তৃপ্ত। সে অর্থে মহালয়া মর্তলোকে পরলোকগত পিতৃগণের একত্র ক্ষণিক আবাস। দশ প্রহরণধারিণী দেবী দুর্গার আগমন-ক্ষণে এ যেন ‘নান্দিমুখ’। দুর্গোৎসবের তিন পর্ব যথা: মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা। মহালয়ায় পিতৃপক্ষ সাঙ্গ করে দেবীপক্ষের দিকে যাত্রা হয় শুরু।
আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠীপূজায় সায়ংকালে অকাল বোধনে খুলে যাবে মা দুর্গার শান্ত-স্নিগ্ধ অতল গভীর আয়ত চোখের পলক। ধূপের ধোঁয়ায় ঢাক-ঢোলক,কাঁসর-মন্দিরার চারপাশ কাঁপানো নিনাদ আর পুরোহিতের ভক্তিকণ্ঠেঃ ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা/নমস্তৈস্য নমস্তৈস্য নমো নম..’ মন্ত্রোচ্চারণের ভেতর দূর কৈলাশ ছেড়ে দেবী পিতৃগৃহে আসবেন গজে। ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে ফিরবেন দোলায়। অর্থাৎ-দোলায়ং মড়কং ভবেৎ। মহালয়ায় অমাবস্যার ভোরেই আকাশবাণী সম্প্রচার করে ‘মহিষাসুর মর্দিনী’।
শ্রীশ্রীচন্ডী, অধ্যায় ৪, শে¬াক ৪ এ দুর্গা সম্পর্কে বলা হয়েছে,’যা শ্রীঃ স্বয়ং সুকৃতিনাং ভবনেষ্বলক্ষ্মী/পাপাত্মনাং কৃতধিয়াং হৃদয়েসুবুদ্ধি/শ্রদ্ধাসতাং কুলজনপ্রভস্য লজ্জা তাং ত্বাং নতা/ স্ম পরিপালয় দেবি বিশ্বম..(পুণ্যবান মানুষের ঘরে তুমি লক্ষ্মী, দুষ্ট পাপীর ঘরে তুমি অলক্ষ্মী, মনস্বীর হৃদয়ে তুমি বুদ্ধি, ভাল লোকের কাছে তুমি শ্রদ্ধা, অভিজাতবংশীয় মানুষের কাছে তুমি লজ্জা।
দক্ষিণ এশিয়ায় এই পুজাকে শরৎ কালের বার্ষিক মহা উৎসব হিসাবে ধরা হয় বলে এটাকে শারদীয় উৎসবও বলা হয়। রামায়ন অনুসারে, অকালে বা অসময়ে দেবীর আগমন বা জাগরণ বলে বসন্ত কালের দূর্গা উৎসবকে বাসন্তি পূজা বা অকালবোধনও বলা হয়।
বাঙালী হিন্দুদের প্রিয় পুজা- শারদীয়া । কলকাতা, হুগলী, শিলিগুড়ি, কুচবিহার, লতাগুড়ি, বাহারাপুর, জলপাইগুড়ি এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল যেমন, আসাম, বিহার, দিল¬ী, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালায় ঘটা করে এই উৎসব পালন করা হয়। নেপালে ও ভুটানেও স্থানীয় রীতি-নীতি অনুসারে প্রধান উৎসব হিসাবে পালন করা হয়। আমাদের বাংলাদেশের ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করা হয় এবং সরকারীভাবে এক দিনের এবং হিন্দুদের জন্য তিন দিনের ছুটি ঘোষনা করা হয়। এই পূজাকে শারদীয় পুজা, শারদোৎসব, মহা পূজা, মাযের পূজা, ভগবতী পূজা এবং বসন্তকালে বাসন্তী পুজা বা অকালবোধন হিসাবে উৎযাপন করা হয়। বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, দিল¬ী, মধ্যপ্রদেশÑএ দূর্গা পূজা, মহারাষ্ট, গুজরাট,উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, কেরালায় , হিমাচল প্রদেশ, মহীশুর, তামিলনাড়–,অন্ধ্র প্রদেশে এ পূজাকে নবরাত্রি পূজা বলা হয়।
এদিকে এবছর দুর্গাপূজায় সারাদেশে ৩৩ হাজার ম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের চেয়ে প্রায় এক হাজারের বেশি ম-প বেড়েছে বলে হিন্দু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন। ঢাকা মহানগর এলাকায় পূজামন্ডপের সংখ্যা ২৫৫টি। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments