শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার অপর দুই সহযোগীর একজন সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনা ও কামালকে আরেকটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব পালন করা চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সর্বোচ্চ শাস্তিে যাগ্য অপরাধ করলেও তাকে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আসামি থেকে রাজসাক্ষী হয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করায় তাকে এ দন্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মূর্তজা মজুমদারের নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সোমবার জনাকীর্ণ এজলাসে এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা। রায় ঘোষণা বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে। রায় ঘোষণাকালে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর এম. তাজুল ইসলাম, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা ও তাদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক। আর কাঠগড়ায় ছিলেন গ্রেপ্তারকৃত একমাত্র আসামি চৌধুরী মামুন। বিচারের শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল। বেশ কয়েকবার তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বললেও তারা ছিলেন অনুপস্থিত। ফলে আইনানুযায়ী তাদেরকে পলাতক দেখিয়ে বিচার কাজ সম্পন্ন করে ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনকে দমাতে বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বিচারে গুলির নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর ব্যবহার করা হয় প্রাণঘাতী অস্ত্র। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া হয় গুলি। যে গুলিতে বাসাবাড়িতে থাকা অনেক শিশুও নিহত হন। আন্দোলনকারীদের চিহ্নিতে ব্যবহার করা হয় ড্রোন। আর আন্দোলন দমাতে সারাদেশে গুলি ছোড়া হয়েছে ৩ লাখ রাউন্ড। যার মধ্যে ঢাকায় ছোড়া হয়েছে ৯৫ হাজার রাউন্ড তাজা গুলি। পুলিশের পাশাপাশি গুলি ছুড়েছে আওয়ামী ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ শত মানুষ। আহত হয়েছে ২৫ থেকে ৩৫ হাজারের মত। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। পতনের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নের্তৃত্বাধীন অন্তবর্তি সরকার যাত্রা শুরু করে। এরপর পুনর্গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তিন জনের বিরুদ্ধে প্ররোচনা, উসকানি, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্র ও উর্দ্ধতন নের্তৃত্বের দায় এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেন চিফ প্রসিকিউটর। ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলাগুলোর মধ্যে এটাই প্রথম মামলা যেখানে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হলো।

রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্কের ব্যাখ্যা তুলে ধরে রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, গত বছর পহেলা জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিন চলা গণআন্দোলনে অভিযুক্ত তিন আসামির যৌথ প্ররোচনা, উষ্কানি ও নির্দেশনায় সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাঁদের নির্দেশেই আন্দোলনকারীদের ওপর ড্রোন, হেলিকপ্টার ও মরণাস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর তাদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার নৃশংস ও নির্মম ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই আসামিদের নির্দেশে সারাদেশে ব্যাপকমাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা রোম সংবিধি অনুসারে স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। শুধু তাই না, এই তিন আসামি ঊর্দ্ধতন অবস্থানে থেকে জুলাই গণআন্দোলনে সংঘটিত অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। নির্দেশদাতা কর্তৃপক্ষ হিসেবে এই নিষ্ক্রিয়তা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার ব্যর্থতাও মানবতাবিরোধী অপরাধ।

‘শেখ হাসিনার বক্তব্য আন্দোলণরত শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্ধ করেছে’
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে গত বছর ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের অপমান করেছে, তাঁদের ক্ষুব্ধ করেছে। যে কারণে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল থেকে রাস্তায় নেমে আসে এবং বক্তব্যের জন্য তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলে। ‘আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’-সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের প্রলুদ্ধ করেছে। তার এই বক্তব্যের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা হামলায় আহতদের চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা দিয়েছে।

‘শেখ হাসিনার ফোনালাপে অপরাধের প্রমাণ’
গত বছর ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি মাকসুদ কামাল, ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার একাধিক ফোনালাপ নিয়েও রায়ে পর্যবেক্ষণ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল বলেন, পলাতক আসামিদের রাষ্ট্র নিযুক্ত কৌসুলি দাবি করেছেন এসব ফোনলাপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। কিন্তু এর স্বপক্ষে উনি কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব ফোনালাপ একাধিকবার আদালত কক্ষে বাজিয়ে শোনানো হয়েছে। এছাড়া প্রসকিউশন দাবি করেছে, এসব ফোনালাপ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে ফরেনসিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং তা শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সত্যিকারের ফোনালাপ। আমরা মনে করি এসব ফোনালাপে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাঁদের হত্যার নির্দেশ প্রদান এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। আমরা এসব ফোনালাপকে সত্য বলেই মেনে নিয়েছি।

‘অপরাধ ছিলো ব্যাপকমাত্রায় ও পদ্ধতিগত’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে দেশের ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্পটে হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় সশস্ত্র নেতাকর্মীরা। ৫১টি জেলায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর মরণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য যত রকমের ব্যবস্থা আছে সবই গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এরই ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালের আন্দোলনে সকল শ্রেনী পেশার মানুষ অংশগ্রহন করে। যাদের সবাই ছিলো সাধারণ-নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র জনতা। আন্দোলনকারীদের সনাক্ত করার জন্য ড্রোন, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, এনটিএমসির মত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল ট্র্যাকিং করে অবস্থান সনাক্ত করে হত্যা, জখম, গ্রেপ্তার, অন্যায় আটকের মত ঘটনা ঘটিয়েছে। এই আন্দোলনে আক্রমণকারীরা ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সরকার দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার। অপরদিকে আন্দোলনকারীরা ছিলেন সাধারণ, নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। এর মাধ্যমে প্রতীয়মাণ হয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা ছিল ব্যাপকমাত্রায়, পদ্ধতিগত এবং লক্ষ্যভিত্তিক।

‘রাজস্বাক্ষীর জবনবন্দিতে অপরাধের সবিস্তার বর্ণনা’
রাজসাক্ষী হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁর সাক্ষ্য তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, গত বছর ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার কাছ থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা আসে। এই সাক্ষী তাঁর স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, সেদিন থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। প্রাক্তন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেন। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কোর কমিটির বৈঠকে কারা উপস্থিত থাকত ও আন্দোলণ দমনে নানা পরামর্শ দিত তাও সবিস্তারে উঠে এসেছে এই জবানবন্দিতে।
‘যে কোন মূল্যে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে’
আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই ট্রাইব্যুণালে এসে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি প্রদানকারী অনেকের হাত, পা, নাক, চোখ, মাথার খুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে পুলিশের গুলিতে। এসব সাক্ষীর বাস্তব অবস্থা দেখলে যে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। ফলে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওয়াতায় আনা উচিৎ। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে ব্যহত হতে দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের শাস্তির রায় ঘোষণা করেন।

যেভাবে দন্ডিত হলেন আসামিরা:
৬টি অপরাধ সংঘটনের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও কামালকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড ও আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তিনটি ঘটনায় এক নম্বর অভিযোগে এই দুই আসামিকে আমৃত্যু করাদন্ড দেয়া হয়। যেখানে বলা হয়, কাউন্ট (ঘটনা) ১: গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকার বলে উস্কানি মূলক বক্তব্য প্রদান করেন শেখ হাসিনা। কাউন্ট ২: ওইদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মাকসুদ কামালের সাথে শেখ হাসিনার ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের রাজাকার বলে তাদের ফাঁসি দিব মর্মে উস্কানি ও আদেশ দেন। এছাড়া অপরাধ সংঘটনে আসামিরা তার অধীনস্থদের (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) কোন বাধা প্রদান করেন নি। কাউন্ট ৩: এরই ফলে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদকে পুলিশ কর্তৃক গুলি করে হত্যা করা হয়। ফলে তাদের আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়া হলো।
তিনটি ঘটনায় শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। কাউন্ট (ঘটনা) ১: গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা সাথে শেখ ফজলে নূর তাপসের এবং পরবর্তীতে হাসানুল হক ইনু সাথে কাথাপকথনে দেখা যায়, আসামি শেখ হাসিনা ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্নয়, আন্দোলনরত ছাত্র জনতাকে হেলিকপ্টার এবং লেখাল উইপন (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দেন। অপরাধ সংঘটনে আসামিরা তার অধীনস্থদের কোন বাধা প্রদান করেন নি।
কাউন্ট ২: যার ফলে ৫ আগস্ট চানখারপুলে ৬ জন আন্দোলনকারীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। কাউন্ট ৩: একই তারিখে আশুলিয়ায় ৬ জন আন্দোলনকারীকে হত্যার পর তাদের লাশ পুড়িয়ে দেয় পুলিশ সদস্যরা। এই অপরাধে মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও কামালের সকল সম্পদ সরকারের পক্ষে বাজেয়াপ্ত করা হয়। সরকার জুলাই এ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বিতরণ করবেন বলে রায়ে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়া উভয় অভিযোগে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের ৫ বছর কারাদন্ড প্রদান। মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ করলেও রাজসাক্ষী হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করায় তাকে এ দন্ড দেয়া হয়।

যেভাবে এগিয়েছে বিচার কাজ:
গত বছরের ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করেন জুলাই গণআন্দোলনে নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যরা। সেসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে বিবিধ মামলা করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তদন্তে প্রাথমিক অপরাধের প্রমাণ পেয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে গত বছরের ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে ফরমাল চার্জ দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ওই বছরের পহেলা জুন ফরমাল চার্জ আমলে নিয়ে জারি করা হয় আবারো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। পরে ট্রাইব্যুনালে হাজিরার জন্য ১৬ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ৩ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের পরই শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহন। ২৮ কার্যদিবসে ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন ও জেরা সমাপ্ত হয়। সাক্ষ্য দিয়েছেন জুলাই গণআন্দোলনে নিহতের স্বজনরা, আহত জুলাই যোদ্ধা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা, ইতিহাসবিদ ও গবেষক, ফরেনসিক এক্সপার্ট, চিকিৎসক ও জব্দ তালিকার সাক্ষীরা। দালিলিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় শেখ হাসিনার চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ। প্রদর্শন করা হয় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতার অসংখ্য ভিডিও ক্লিপ। যেসব ভিডিও ক্লিপে উঠে এসেছে পুলিশ কিভাবে খুব কাছ থেকে নিরস্ত্র সাধারণ ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে। চিফ প্রসিকিউটরের পাশাপাশি মামলাটি পরিচালনা করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মো. মিজানুল ইসলাম, আব্দুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহম্মেদ, বিএম সুলতান মাহমুদ, এসএম মইনুল করিম প্রমুখ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments