অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একুশে পদকপ্রাপ্ত এ কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার মেয়ে সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম।
তিনি বলেন, বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন যান এ কণ্ঠশিল্পী।
শুক্রবার মগবাজার ওয়্যারলেস জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বিকেলে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয় বলে জানান রুমানা।
মাহবুবা রহমানের মৃত্যুতে শিল্প-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। শোক প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শবনম, সুরকার ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান, পরিচালক মতিন রহমান, ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ফোয়াদ নাসেরসহ অনেকে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৫ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া মাহবুবা সংগীতজগতে পা রাখেন অল্প বয়সেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে তার গান প্রথম প্রচারিত হয়। তখন তিনি নিভা রানী রায় নামে বেতারে গান করতেন।
১৯৪৮ সালে ঢাকার কামরুননেসা গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর আর পড়াশোনা করেননি। এরপর কেবলই সঙ্গীতে তার পথচলা।
১৯৫৯ সালে মাহবুবা রহমান বিয়ে করেন খান আতাউর রহমানকে। এই সংসারে তাঁর তিন সন্তান-রাহিলা খান, রুমানা ইসলাম, খান ইমানুর রহমান। রাহিলা চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে এখন যুক্তরাজ্যে কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ও ছেলে ইমানুর রহমান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে এখন অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি করছেন।
আরেক মেয়ে রুমানা ইসলাম বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কর্মরত আছেন। এর আগে আবুল হাসনাতের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ান। সেই সংসারে মারুফ হাসনাত ও বাবন হাসনাত নামে ছেলেসন্তানের জন্ম হয়।
পঞ্চাশ ও সত্তর দশকে রেডিও ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে মাহবুবা রহমান ছিলেন অন্যতম। পল্লিগীতি ও আধুনিক গানে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল।
দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ সমর দাসের সুরে তিনি গেয়েছিলেন ‘মনের বনে দোলা লাগে’, যা তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আরও রয়েছে খান আতাউর রহমানের সুরে জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ ছবির ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’, ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’।
‘আসিয়া’ ছবিতে গেয়েছিলেন ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে/আমার হার পরে আর কি লাভ হবে সখি…’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’ ছবির ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’। এছাড়া তিনি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘কখনো আসেনি’, ‘সূর্যস্নান’, ‘সোনার কাজল’, ‘রাজা সন্ত্রাসী’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’সহ বহু চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন।
রেকর্ডের যুগে মাহাবুবা গেয়েছিলেন শতাধিক গান। মমতাজ আলী খানের সঙ্গে তার গাওয়া-‘যাইয়ো না যাইয়ো না বন্ধুরে’ এবং ‘ও বৈদেশী নাগর’ গান দু’খানি এক সময় ছিল মানুষের মুখে মুখে। সংগীতে বিশেষ অবদান রাখায় ১৯৯৮ সালে একুশে পদক পান মাহবুবা।



