দেশীয় বাগানে হাজার হাজার টন রাবার, তবু বাড়ছে ভারত থেকে আমদানি

দেশের রাবার বাগানগুলোতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক রাবার বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। অথচ একই সময়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রাবার আমদানি বেড়েই চলেছে। ফলে উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য হারাচ্ছেন, বাগান মালিকরা লোকসান গুনছেন এবং সম্ভাবনাময় দেশীয় রাবার শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৩ একর জমিতে রাবার চাষ হয়। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বছরে উৎপাদিত হয় প্রায় ৭০ হাজার ৩৫৭ টন প্রাকৃতিক রাবার। উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে বেসরকারি বাগান থেকে। কিন্তু উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও শিল্পকারখানার বড় একটি অংশ এখনো আমদানিকৃত রাবারের ওপর নির্ভরশীল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪ হাজার ১৯৯ টন রাবার আমদানি করেছে, যার মূল্য ১০৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এই প্রবণতা দেশীয় উৎপাদকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাবার বাগান মালিকদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাবারের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হলেও কার্যকর বাজারব্যবস্থা না থাকায় তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অনেক বাগানে মাসের পর মাস রাবার শিট গুদামে পড়ে থাকে। অন্যদিকে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম দামের অজুহাতে বিদেশি রাবার আমদানিতে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ রাবার বাগান মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, সরকার যদি দেশীয় রাবার ব্যবহারে

শিল্পকারখানাগুলোকে উৎসাহিত করে এবং আমদানি নীতিতে ভারসাম্য আনে, তাহলে দেশের রাবার শিল্প দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তারা রাবারকে কৃষিপণ্য হিসেবে অধিক সুবিধা দেওয়া, সহজ শর্তে ঋণ, কর-সুবিধা এবং স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য বাজার নিশ্চয়তার দাবি জানিয়েছেন।

বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে রাবার ও রাবারজাত শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে এসিআই মটরস, বাংলাদেশ হোন্ডা (প্রা:) লিমিটেড, স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালস, কিউআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও মাজেন বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের শিল্প-উপযোগী রাবার ও রাবারজাত উপকরণ আমদানি করে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় উৎপাদন অবিক্রিত রেখে আমদানি বাড়তে থাকলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে ওঠা শত শত রাবার বাগান এবং এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিক ও উদ্যোক্তার জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

তারা সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন—দেশীয় রাবার ক্রয়ে শিল্পকারখানার জন্য নীতিগত অগ্রাধিকার, আমদানিকৃত রাবারের মান কঠোরভাবে যাচাই, নিম্নমানের রাবার আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা।

রাবার খাতের উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, সঠিক নীতিগত সহায়তা মিললে বাংলাদেশ শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণই নয়, ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক রাবার রপ্তানির মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন উপেক্ষা করে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে থাকলে সেই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments