হুমায়ুন আজাদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বহুমাত্রিক লেখক, ভাষাবিজ্ঞানী, কবি ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে নিজ বাসায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সাহিত্যে স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি, প্রথাবিরোধী চিন্তা এবং ধর্ম, মৌলবাদ, নারীবাদ, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে তীক্ষ্ণ লেখার কারণে বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও বিতর্কিত এক ব্যক্তিত্ব।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর বাংলা একাডেমির সামনে সন্ত্রাসীদের চাপাতির হামলায় গুরুতর আহত হন হুমায়ুন আজাদ। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জার্মানি যান।

জার্মানিতে যাওয়ার পর তিনি রোমান্টিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হাইনরিশ হাইনের ওপর পিএইচডি গবেষণার জন্য বৃত্তি লাভ করেন। ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট তিনি জার্মানির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। এর পাঁচ দিন পর ১২ আগস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাটে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

জন্ম ও শিক্ষকতা জীবন

হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের রাড়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি অধ্যাপক হন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সমাজ ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন। আশির দশকের শেষভাগ থেকে গণমাধ্যমে সমকালীন ও রাজনৈতিক বিষয়ে তার লেখালেখি ও বক্তব্য পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে লেখালেখির মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ও সমকালীন বিষয়ে লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি তার লেখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

সাহিত্যকর্ম

হুমায়ুন আজাদের কবিতায় যেমন ছিল নিজস্ব ভাষাশৈলী, তেমনি তার উপন্যাস ও প্রবন্ধে ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা অসংগতির তীব্র সমালোচনা।

তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘অলৌকিক ইষ্টিমার’, ‘জ্বলো চিতাবাঘ’, ‘যতই গভীরে যাই মধু যতই উপরে যাই নীল’ এবং ‘আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে’।

উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’, ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’, ‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ’, ‘যাদুকরের মৃত্যু’, ‘শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার’, ‘রাজনীতিবিদগণ’, ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’ এবং ‘ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ’।

ভাষাবিজ্ঞান বিষয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে লেখা ‘বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র’, ‘তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান’ এবং ‘অর্থবিজ্ঞান’ গ্রন্থ তিনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রবন্ধ ও শিশু-কিশোর সাহিত্য

সাহিত্য-সমালোচনা ও মননশীল রচনার ক্ষেত্রেও হুমায়ুন আজাদ ছিলেন সক্রিয়। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’, ‘বিমূর্তীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘ভাষা-আন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমি’ এবং ‘নরকে অনন্ত ঋতু’।

শিশু-কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন বেশ কিছু জনপ্রিয় বই। এর মধ্যে রয়েছে ‘লাল নীল দীপাবলি’, ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’, ‘কতো নদী সরোবর’, ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ ও ‘বুকপকেটে জোনাকিপোকা’।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হুমায়ুন আজাদ ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। পরে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিতর্ক

লেখক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি হুমায়ুন আজাদ তার তীব্র ও প্রথাবিরোধী বক্তব্যের কারণে জীবদ্দশায় ব্যাপক বিতর্কেরও জন্ম দেন।

তার ‘নারী’, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ এবং ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’সহ কয়েকটি বই নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। এসব বিতর্কের জেরে তার কিছু গ্রন্থ নিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।

বিশেষ করে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ প্রকাশের পর ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। বইটির বিষয়বস্তু ও ভাষা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০০৪ সালে বইমেলা থেকে ফেরার পথে তার ওপর হামলার ঘটনাও তার জীবন ও সাহিত্যকর্মকে ঘিরে বিতর্ককে আরও গভীর করে।

মৃত্যু ও স্মরণ

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পরও তার সাহিত্য ও চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভাষাবিজ্ঞান, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সমকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক বিশ্লেষণে তার রেখে যাওয়া কাজ বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আলোচনাসভা, স্মরণ অনুষ্ঠান ও তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আজ তাকে স্মরণ করা হবে।

প্রথাবিরোধী চিন্তা, যুক্তিবাদী অবস্থান এবং সাহিত্যে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহসের কারণে মৃত্যুর ২২ বছর পরও বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে হুমায়ুন আজাদ একটি আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments