পোলাওর চাল ২৩০ টাকা কেজি

বিরিয়ানির বাজারে আগুন

রপ্তানি নাকি কৃত্রিম সংকট

পোলাওর চাল এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে ভালো মানের প্যাকেটজাত পোলাওর চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২১০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। খোলা পোলাওর চালও বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরাও।

বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—হঠাৎ করে সুগন্ধি চালের এমন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কারণ কী? রপ্তানির অনুমোদন বেড়ে যাওয়ায় কি দেশের বাজারে সরবরাহ কমেছে, নাকি বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুতের কারণে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট?

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা এবং খোলা পোলাওর চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মাস আগেও কোনো কোনো ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং খোলা পোলাওর চাল প্রায় ১১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।

শুধু খুচরা বাজারেই নয়, পাইকারিতেও বেড়েছে দাম। এক মাস আগে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। বর্তমানে একই বস্তার দাম উঠেছে ৯ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসেই বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা।

কেন বাড়ছে পোলাওর চালের দাম?

পোলাওর চাল মূলত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে উৎপাদিত হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধানের চাষ হলেও দিনাজপুরে এর বড় একটি অংশ উৎপাদিত হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দিনাজপুরে মোট ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর। এর মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর এ ধানের আবাদ হয়েছিল ৯৪ হাজার হেক্টরে। অর্থাৎ আবাদি জমির পরিমাণ সামান্য বেড়েছে।

তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে দাম কমার বদলে উল্টো বেড়েছে। এর পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের একাংশের দাবি, সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই দেশীয় বাজারে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট আরেকটি পক্ষের অভিযোগ, উৎপাদন মৌসুমেই বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে। পরে ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে চালের দামও বাড়ানো হয়েছে।

রপ্তানির অনুমোদন প্রায় দ্বিগুণ

সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রপ্তানির বিষয়টিও সামনে এসেছে। চলতি অর্থবছরে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে অনুমোদিত রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯৫৯ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানির অনুমোদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, রপ্তানির অনুমোদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দামও দ্রুত বেড়েছে। রাজধানীর তুরাগ এলাকার নতুন বাজারের সাদ্দাম জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন বলেন, এবার আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে পোলাওর চাল রপ্তানি হচ্ছে। এ কারণে বাজারে দাম বেড়েছে।

তার দাবি, পোলাওর চালের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য উন্নতমানের চালের বাজারেও। ভালো মানের নাজির ও কাটারিভোগ চালের দামও এ কারণে বেড়েছে বলে জানান তিনি।

‘রপ্তানির কারণে সংকট হওয়ার কথা নয়’

তবে রপ্তানিকারকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, দেশের উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় সুগন্ধি চালের যথেষ্ট উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে অল্প পরিমাণ চাল রপ্তানি হওয়ার কারণে দেশের বাজারে সংকট তৈরির যুক্তি নেই।

বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসাইন জানিয়েছেন, গত এক মাসে প্রায় ২ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে অন্তত ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। ফলে প্রায় ৬ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা।

রপ্তানিকারকদের যুক্তি, এই বিপুল উদ্বৃত্তের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। তাই রপ্তানির কারণে দেশের বাজারে পোলাওর চালের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।

‘কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা’

অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিলগুলো উৎপাদন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেছে। পরে বাজারে ধানের দাম বেড়েছে—এমন যুক্তি দেখিয়ে চালের দামও বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামানও মনে করেন, শুধু রপ্তানিকে দায়ী করে সুগন্ধি চালের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, দেশে বছরে ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকে। ফলে রপ্তানির কারণে বাজারে এত বড় সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। একটি শ্রেণির ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর জন্য রপ্তানিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন।

পরিবহন খরচ ও জ্বালানি সংকটের অজুহাত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার মতে, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ার কারণে যদি চালের দাম বাড়ত, তাহলে অন্যান্য জাতের চালের দামও একইভাবে বাড়ার কথা।

ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ

পোলাওর চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে শুধু বাসাবাড়ির রান্নায় নয়, রেস্টুরেন্ট ও খাবারের ব্যবসাতেও। বিশেষ করে বিরিয়ানি, কাচ্চি, পোলাওসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবার তৈরিতে সুগন্ধি চালের ব্যবহার বেশি হওয়ায় বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও দাম কেন এতটা বেড়েছে—এ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। রপ্তানির অনুমোদন, ধান-চালের মজুত, বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ীদের কারসাজি—সবকিছুই খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন, মজুত, রপ্তানি ও বাজারে সরবরাহের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা গেলে পোলাওর চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments