আপিলে তারেক রহমানসহ ৪৯আসামির খালাসের রায় বহাল

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলো মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১২ আসামি। আসামিদের দেয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হয়েছিলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৪৯ জনকে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় আসামিদের কাছ থেকে এ জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে সেগুলো স্বেচ্ছাপ্রণেদিত কিনা তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে বলে অভিমত দিয়েছে আপিল বিভাগ। একারনে ওই জবানবন্দির ভিত্তিতে সকল আসামিকে দেওয়া সাজা বাতিল করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলো তা বহাল রেখেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে বৃহস্পতিবার এই রায় দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নের্তৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ। এছাড়া মামলাটি পুনরায় তদন্তের বিষয়ে হাইকোর্ট যে অভিমত দিয়েছিলো তাও বাতিল করেছে আদালত। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন: বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
রায় বহালের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ বলেছে, এই মামলায় মুফতি হান্নানসহ ১২ জন আসামির স্বীকারোক্তিমূল জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যে পরিস্থিতিতে আসামিদের কাছ থেকে জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে সেগুলো কতটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ আছে। কারন মামলায় কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হান্নান প্রথম জবানবন্দি দেওয়ার চার বছর পর দ্বিতীয় জবানবন্দি দেন। দ্বিতীয় জবানবন্দি রেকর্ডের আগে তিনি অন্য মামলায় দীর্ঘদিন কনডেম সেলে ছিলেন। অন্য আসামিরাও দীর্ঘ সময় পুলিশ হেফাজতে থাকার পর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দি দেন। এছাড়া একইদিনে তিনজন আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট, যা অস্বাভাবিক। এভাবে জবানবন্দি রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত নিয়ম নীতির গুরুতর লংঘন। আপিল বিভাগ বলেছে, মামলার বিচারের সময় অধিকাংশ আসামি তাদের জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল- স্বীকারোক্তি নেওয়ার আগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাঁদের অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ণ করে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া অবৈধভাবে হেফাজতে রেখেছিল। ফলে তাদের জবানবন্দি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আপিল বিভাগ বলেছে, মুফতি হান্নানকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় এই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আত্মপক্ষ সমর্থন করার আগেই তাকে অন্য একটি মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। দোষ স্বীকারোক্তির বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়ায় মামলাটিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে। ফলে আসামিদের এসব স্বীকারোক্তি হয় চাপ প্রয়োগ করে, নয় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আদায় করা হয়েছে, যা আইনের চোখে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আদালত বলেন, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এই স্বীকারোক্তিগুলো নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ বিষয়টি হাইকোর্টের রায়ে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা পর্যালোচনা করা উচিত ছিল।
আপিল বিভাগ বলেছে, মামলাটি নতুন করে তদন্ত করা প্রয়োজন মর্মে হাইকোর্টের দেয়া পর্যবেক্ষণ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারন কোনো নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে প্রভাব তৈরি করে এমন কোনো পর্যবেক্ষণ আদালত দিতে পারে না। ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির ভিত্তিতে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ বাতিল করা প্রয়োজন। এটা নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে বিচারিক হস্তক্ষেপের সামিল। এই পর্যবেক্ষণ ব্যাতীত হাইকোর্টের রায়ে কোনো ত্রুটি বা অবৈধ কিছু খুঁজে না পাওয়ায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখা হলো। একইসঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত (বিচারিক আদালতের রায়ে) যেসব আসামি আপিল করেননি, খালাসের এই রায় তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। মামলায় কারো বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলে তা প্রত্যাহার করা হলো।
রায়ের পর আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, এ রায়ের মধ্যদিয়ে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ ন্যায়ের মানদন্ড আবার উঁচু করে ধরলেন। আবার প্রমাণিত হলো আইনের শাসন আছে। বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসি বা সাজা দেওয়া যাবে না। তারেক রহমানের কৌসুলি ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও ব্যক্তিগত জিঘাংসা থেকে তারেক রহমানকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে তারেক রহমান নির্দোষ। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত হয়েছে, এই ঘটনায় আইভি রহমানসহ যাদের অনাকাঙ্খিত মৃত্যু হয়েছে, শেখ হাসিনা সেইসব মৃত্যুর বিচার চাননি। যদি শেখ হাসিনা প্রকৃত অপরাধীদের বিচার চাইতেন, তাহলে হয়তো রাজনৈতিক জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে তারেক রহমানকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করতেন না। অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, যারা ভিকটিম ছিলেন তাদেরও যেমন ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার আছে, যারা আসামি হবেন তাদের যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সাজা দিতে পারবেন না। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে সাজা দেওয়া যায় না। ফলে আজকের রায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে আসামির এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।
প্রসঙ্গত: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আহত হন অনেকে। মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়েরকৃত দুটি মামলায় ২০০৮ সালের ১১ জুন দেয়া প্রথম অভিযোগপত্রে হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটি অধিকতর তদন্ত করে। সেই তদন্তকালীন সময়ে মুফতি হান্নানকে ৪১০ দিন টিএফআই সেলে রেখে দ্বিতীয় জবানবন্দি আদায় করা হয়। সেই জবানবন্দির ভিত্তিতে দেয়া চার্জশিটে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আরো ৩০ জনকে যুক্ত করা হয়। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর দুটি মামলায় বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ড এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে ডাবল যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে দন্ড পান আরো ১১ জন। ওই রায় বাতিল চেয়ে আপিল করেন আসামিরা। গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ সাজার রায় বাতিল করে সকলকে বেকসুর খালাস দেন। সেই রায় বহাল রাখল আপিল বিভাগ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments